বিশ্বব্যাপী তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক উন্নয়নে মানুষের জীবনের বড় একটি অংশ দখল করে নিয়েছে প্রযুক্তি। মানুষ দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সকল কাজেই প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এখন বিভিন্ন অপরাধ ঘটছে ইন্টারনেট, ফেসবুক ও মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। বিশেষ করে ফেসবুকে ব্ল্যাকমেইল করা হয় নারীদের। লম্পটদের প্রেম, ছলচাতুরি ও অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায়, নোংরা ছবি জুড়ে দেওয়া হয় স্কুল-কলেজের কোমলমতি মেয়েদের সাথে। লজ্জায়, অপমানে অনেক নারী আত্মহত্যাও করেছেন। দেখা যাচ্ছে সুদক্ষ অপরাধীরাও যেকোনো অপরাধ বা হত্যাকা- করার সময় নিজের অজান্তেই রেখে যাচ্ছে অপরাধের নানা প্রমাণ সেটা অডিও, ভিডিও, ছবিও হতে পারে। সম্প্রতি আবরার হত্যাকা-ের ঘটনাও এমন হয়েছে। খুনিদের অজান্তেই সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে তাদের খুনের দৃশ্য। শুধু আবরার নয়, বর্তমানে এমন প্রচুর অপরাধ ঘটছে ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন ও কম্পিউটার প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে। যেগুলোর সাক্ষ্যপ্রমাণ রয়ে যাচ্ছে সেই ইন্টারনেট ও সংশ্লিষ্ট ডিভাইসগুলোতেই। প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। তাই, বিচারে ভিডিও ফুটেজকে সাক্ষ্য হিসেবে গণ্য করা প্রয়োজন।
কিন্তু আমরা দেখছি, দেশের কোনো আদালতেই অডিও-ভিডিও উপস্থাপনের প্রযুক্তিগত কোনো সুযোগ নেই। এমন জটিলতা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ইতোপূর্বে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া দুদক পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির ও ডিআইজি মিজানের ঘুষ লেনদেনের অডিও-ভিডিওকে প্রমাণ হিসাবে রাখতে গিয়ে গত ২১ আগস্ট বিচারিক কার্যক্রমে ইলেকট্রনিক রেকর্ডকে সাক্ষ্য-প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারের লক্ষ্যে সাক্ষ্য আইন-১৮৭২ যুগোপযোগী করার জন্য আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে দুদক। আমাদের জানা মতে, এখন পর্যন্ত সাক্ষ্য আইন সংশোধনের এই প্রস্তাব চিঠি চালাচালিতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
ইতোপূর্বে বরগুনায় আলোচিত রিফাত হত্যা, শিবির সন্দেহে প্রকাশ্যে বিশ্বজিৎকে কুপিয়ে হত্যা, শিশু রাজন হত্যা, গাইবান্ধার সাবেক সাংসদ মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন হত্যা, রাজধানীর বাড্ডায় গুজবের শিকার রেনু হত্যা ইত্যাদি মামলার ঘটনায় ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজই প্রমাণ করে কারা ওই খুনের সাথে জড়িত। এমনকি এসব হত্যায় ভিডিও ফুটেজ ছাড়া তেমন কোনো প্রমাণও নেই। আলোচিত বিশ্বজিৎ হত্যার সময় ধারণকৃত ভিডিওটিও বিচারে কোনো কাজে লাগেনি। ফলে আসামিরা আইনি ফাঁকফোকর গলে বেরিয়ে এসেছে। সিলেটে খাদিজাকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা কিংবা বুয়েট ছাত্র আবরারকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় সিসিটিভি ক্যামেরার ধারতকৃত ভিডিও ফুটেজই মূল প্রমাণ। কিন্তু ১৮৭২ সালের পুরানো সাক্ষ্য আইনের ৩য় ধারায় প্রমাণ হিসাবে যে পাঁচটি উদাহরণ দেয়া আছে তাতে অডিও বা ভিডিও রেকর্ডকে উপকরণ হিসাবে গ্রহণ করার কোনো বিধান নেই। ফলে ধারণকৃত এসব ভিডিও বা অডিও প্রমাণ হিসাবে গ্রহণ করা বা না করা সম্পূর্ণ বিচারকের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। অথচ ইতোমধ্যে ভারতে সাক্ষ্য আইনের ৩(১)নং উপধারা সংযোজন করে ডিজিটাল, ইলেকট্রনিক সাক্ষ্যকে গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্য হিসেবে গণ্য করা হয়। বর্তমান সময়ে আমরাও অত্যন্ত জরুরি মনে করছি, তথ্যপ্রযুক্তির সাথে সামঞ্জস্য রেখে, যুগ উপযোগী করে দ্রুত ১৪৭ বছরের পুরানো সাক্ষ্য আইন পরিবর্তনের। আমরা মনে করি, বিচারে ডিজিটাল, ইলেকট্রনিক সাক্ষ্যকে গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্য হিসেবে গণ্য করা হোক।